১০ জুন ঐতিহাসিক ‘ভূমি অধিকার দিবস-২০২৩
১৯৮৫ সালের এই দিনে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার ঘুঘুদহ বিলে প্রায় ২০ হাজার ভূমিহীন কৃষক-জনতা খাস জমির দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিলেন।

জোতদারদের ভাড়াটিয়া লাঠিয়াল বাহিনীর হামলায় এদিন শহীদ হন ভূমিহীন কৃষক এন্তাজ আলী, শহীদ মিয়া, লোকমান হোসেন, লাল মোহন ও কলিম উদ্দিন। সেই থেকে প্রতিবছর শ্রদ্ধার সঙ্গে এদিনে স্মরণ করে সংগ্রামী এই ভূমিহীন শহীদ সৈনিকদের স্মরনে।

এ দিন উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয় ভূমিহীন অধিকার পরিষদ,গাজীপুর মহানগর শাখা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
১০ জুন গাজীপুরের ভোগড়া,বাইপাচ বিশ্বরোড পুলিশ বক্সের সামনে বাংলাদেশ জাতীয় ভূমি অধিকার পরিষদ গাজীপুর মহানগর শাখার সভাপতি শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে রেলি ও সমাবেশ করেছেন ভূমিহীনরা।

দিনটিকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘ভূমি অধিকার দিবস’ হিসেবে পালনের দাবি জানিয়েছেন।

প্রধান বক্তা হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় ভূমি অধিকার পরিষদ কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম বলেন ওই ৫ জনের রক্তে স্থানীয়দের ভূমির ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আর ভূমিহীনরা তাদের বেঁচে থাকার দিশাও পেয়েছে।
ওই সময়ে ভূমিহীনদের জন্য কিছু খাস জমি সরকারের পক্ষ থেকে বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনেও তা জোতদারদের কবল থেকে উদ্ধার করতে না পারায় এ আন্দোলনের সূচনা হয়।

তিনি জানান, ১৯৭৪ সালে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের দীর্ঘ পথ পার করে হাজার হাজার কৃষক এই দিনে জোতদারের কাছ থেকে ছিনিয়ে এনেছিলেন তাদের অধিকার। এই দিনটিকে স্মরণ করেই ‘ভূমি অধিকার দিবস’ পালিত হয়ে আসছে।

তিনি আরো জানান, জোতদারদের মিথ্যা মামলায় প্রায় এক যুগ ধরে নির্যাতন আর কারাবরণের শিকার হতে হয়েছে ঘুঘুদহ বিলের অসংখ্য ভূমিহীন কৃষক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের।

ভূমি অধিকার দিবসটি সরকার ঘোষিত কোনো দিবস নয়। কিন্তু, এ দিনটির তাৎপর্য শ্রেণী সংগ্রামের ক্ষেত্রে অন্যতম একটি সাফল্য। সাম্প্রতিক সময়ের এক জরিপে এ দেশে ভূমিহীনের সংখ্যা ১১ কোটির বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের অর্ধেকই বর্গাচাষী। অন্যের জমিতে চাষ করে তার সামান্য অংশ দিয়ে তারা গোটা পরিবারের জীবন ধারণের চেষ্টা চালান।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘ভূমি ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম বর্গাচাষীদের দুর্দশার জন্য প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে দায়ী। ভূমি অধিদপ্তর খাস জমির তত্ত্বাবধান করে, কিন্তু ভূমিহীনদের তালিকা করে পর্যায়ক্রমে তা বণ্টন করে না। ’

তিনি আরো বলেন, ‘রাজস্ব আদায়ই ভূমি প্রশাসনের একমাত্র কাজ নয়। নামজারি থেকে শুরু করে ভূমির মালিকানা দেওয়া, রেকর্ড সংশোধন, মালিকানা পরিবর্তন, ভূমিহীনদের তালিকা ও নতুন জমিতে পর্যায়ক্রমে তাদের অধিকার নিশ্চিত করা, অবৈধ দখল রোধ, গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প বাস্তবায়ন, রেকর্ড তৈরি, দলিল প্রস্তুত করা সবই তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু তারা এ ক্ষেত্রে সব সময়ই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। ’

এদিকে ‘আমাদের দেশে ফৌজদারি যে সব মামলা হয়, তার বেশির ভাগই জমি-জমা সংক্রান্ত। জমির মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে দেশের সর্বত্র নানা ধরনের জটিলতা বিদ্যমান। প্রতিদিন এ সমস্যা আরো বেড়েই চলেছে। ’

তিনি বলেন, ‘ভূমি ব্যবস্থাপনা আইন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন এবং দুর্নীতি, অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব হলে দেশের ফৌজদারি মামলার সংখ্যা অনেক কমে যাবে। ’

নেতৃবৃন্দ দাবি করেছেন, ‘ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের মূল দায়িত্ব ভূমি অধিদপ্তরের। তাই, সরকারেরই উচিত এই অধিদপ্তরে লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা। তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার না করা। ’

তারা বলেন, ‘এক শ্রেণীর আমলা রয়েছে, যারা খাস জমি কুক্ষিগত করে রাখতে চায়। এদের সম্পর্কে সরকারকে সচেতন হতে হবে। ’

‘আলো, বাতাস, জল, বৃক্ষাদি, বনরাজি এবং ভূমির ওপর জনগণের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ’

তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এক শ্রেণীর প্রভাবশালী এই সকল সম্পদের ওপর নানা অন্যায় ও অবৈধভাবে দখল-নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে চলেছে। যদিও সরকার বিভিন্ন সময়ে ভূমি দস্যুদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি ও আইন এবং নানা বিধি প্রণয়ন করে। কিন্তু বাস্তবে তার কোনো প্রতিফল দেখা যায় না।
পাবনার কৃষকদের আত্মদান বড় ঘটনা হলেও কোনো সরকারই এর প্রতি নূন্যতম শ্রদ্ধা দেখায়নি। আমরা প্রতিবছরই দিনটি পালন করে আসছি। এবারেও বিভিন্ন কর্মসূিচ গ্রহণ করেছি।
ভূমির অধিকার মানবাধিকার
দারিদ্র্য বিমোচনে চাই সমন্বিত ভূমি সংস্কার।

খাস জমির অধিকার, ভূমিহীন জনতার
ভূমিদস্যু ঠেকাও, ভূমিহীন বাঁচাও।

১০ জুন ভূমি অধিকার দিবস ২০২৩ এর দাবিসমূহ।

• প্রকৃত পেশাদার মৎস্যজীবীদের মাঝে সমস্ত জলমহাল বন্দোবস্ত দিতে হবে। কৃষকরার্থ-
বিরোধী ও পরিবেশবিধ্বংসী চিংড়ি চাষ বন্ধ করতে হবে।

অবিলম্বে সকল খাসজমি প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে। বন্টন করতে হবে।

১৯৯৪ সালের শিকস্তি-পয়স্তি আইনের সংশোধনী বাতিল করতে হবে।

সকল ধর্মের নারীদের জন্য সম অধিকারের স্বীকৃতির ভিত্তিতে প্রচলিত উত্তরাধিকার আইন
সংশোধন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

সমতল ও পাহাড়ী আদিবাসীদের ভূমি জবরদখলকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টামূলক শাস্থি দিতে হবে।

আদিবাসীদের ঐতিহ্য ও প্রথাগত ভূমির তাধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে।

আদিবাসীদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ, নিপীড়ন-নির্যাতন বন্ধ করতে হবে ।

আখ চাষিদের আখের ন্যায়মূল্য দিতে হবে এবং ওজনে কারচুপি বন্ধ করতে হবে। বর্গা আইন বাস্তবায়ন করতে হবে।

বাজারদর অনুযায়ী কৃষি মজুরি পুনর্নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন ও পার্বত্য ভূমি কমিশন কার্যকর
করতে হবে।
উক্ত রেলি ও সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন শ্রমিক নেতা তমিজউদ্দিন তনু, কৃষকলীগ নেতা নজরুল ইসলাম, শ্রমিক নেতা হামিদ সরকার, ভূমিহীন নেতা সেলিম মিয়া, শ্রমিক নেত্রী লাভলি আক্তার,আব্দুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম, মানবাধিকার কর্মী আলামিন, ভূমিহীব নেত্রী সেলিনা রহমানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ এবং প্রকৃত ভূমিহীন রা উপস্থিত ছিলেন ।

তিনি বলেন, ‘আমাদের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে প্রকৃত ভূমিহীনদের তালিকা করা হচ্ছে জেলা প্রশাসক কার্যালয় ভূমিহীনদের সাথে নিয়ে স্মারকলিপি দেয়া হবে।
পোস্টটি শেয়ার করুনঃ