শনিবার ১৩ ই আগষ্ট ২০২২

মানস বন্দ্যোপাধ্যায়

ভারতের স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্ন হলো। যদিও এটি ১৫ আগস্টকে স্বাধীনতা দিবস হিসাবে ধরে নিলে। কিন্তু ১৯৪৩ সালের ২১ অক্টোবর সিঙ্গাপুরে নেতাজির ঘোষিত অবিভক্ত ভারতের প্রথম স্বাধীনতা দিবস হিসাবে ধরে নিলে এখন স্বাধীনতার ৭৯ তম বর্ষপূর্তি। সেদিন নেতাজির সেই আজাদ হিন্দ সরকারকে বিশ্বের ৯ টি রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিয়েছিল। তার মধ্যে জাপান, জার্মানি,চিন, বার্মা ( মায়ানমার) ,থাইল্যান্ড, ক্রোশিয়া,ইন্দোনেশিয়া উল্লেখযোগ্য। যাই হোক, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতাজির ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা এসেছে নেতাজির শৌর্য ও বীরত্বের ফলে।সঙ্গে সঙ্গে তার মতো অসংখ্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ইংরাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছিলেন বলে। ইংরেজরা যে ভারত ছেড়েছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্যই সেকথা তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধান মন্ত্রী লর্ড এটলি নিজেই স্বাধীনতার পর কলকাতায় এসে স্বীকার করেছেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, চন্দ্র বোসের সশস্ত্র সংগ্রামের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় সেনার ওপর তার প্রভাব এবং তার ওপর হিন্দু মুসলিম, শিখ ধর্মের মানুষের অগাধ আস্থা এবং তার আই এন এ বাহিনীর আক্রমণ ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ফলে ইংরেজদের ভারত ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ভারতের সংবিধান রচয়িতা আম্বেদকর পর্যন্ত বলেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুই প্রকৃতার্থে ভারতের স্বাধীনতার মূল হোতা।
এই বীর বিপ্লবী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্ব প্রথম গুপ্তচর ছিলেন নীরা আর্য। কী অসীম সাহসে ভর করে নীরা তার নেতার কাছে ব্রিটিশ সরকারের গোপন তথ্য উদ্ধার করে আনতেন সেগুলি শুনলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসবে। নেতাজির গতিবিধি জানতে ব্রিটিশ পুলিশ তার ওপর নির্মম, বর্বর ,অকথ্য অত্যাচার করেছিল এমন কি কথা বের করার জন্য একটি ধারালো ছুরি দিয়ে তার স্তন উপড়ে ফেলাও হয়েছিল।

কে ছিলেন নীরা আর্য?

ব্রিটিশ ভারতের সিআইডি ইন্সপেক্টর ছিলেন শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাস। শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাস ছিলেন ইংরেজ প্রভুভক্ত অফিসার। ব্রিটিশরা শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাসকে গুপ্তচরবৃত্তি করে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুকে হত্যা করার দায়িত্ব দিয়েছিল | একসময় সুযোগ পেয়ে শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাস নেতাজিকে হত্যার জন্য গুলি চালিয়েছিলেন, কিন্তু সেই গুলি নেতাজির গাড়ীর চালককে বিদ্ধ করে। সেখানেই সেই মুহূর্তে উপস্থিত ছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের ’রানী ঝাঁসি রেজিমেন্ট’-এর সদস্যা নীরা আর্য।জয়রঞ্জনকে তিনি দ্বিতীয় সুযোগ দেননি। চোখের পলকে নীরা আর্য শ্রীকান্ত জয়রঞ্জনের পেটে বেয়নেট চালিয়ে হত্যা করেছিলেন। শুনলে আশ্চর্য হতে হবে এই শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন ছিলেন নীরা আর্য র স্বামী। শুধু এটুকুই তাঁকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু আমরা ভারতীয়রা কজন তাকে মনে রেখেছি? নেতাজি ও দেশের জন্যে নিজের স্বামীকে হত্যা করতেও দ্বিধা বোধ করেননি নীরা আর্য । এই ঘটনার পর নেতাজি নীরাকে অভিহিত করেছিলেন ‘নাগিনী’ নামে।

নীরা আর্য ১৯০২ সালের ৫ মার্চ ভারতের তৎকালীন ইউনাইটেড প্রদেশের অধুনা উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতা শেঠ ছজুমল ছিলেন সে সময়ের এক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। তাঁর পিতার ব্যবসার মূল কেন্দ্র ছিল কলকাতা। তাই কলকাতাতে তাঁর পড়াশোনা শুরু হয়েছিল। নীরা আর্য হিন্দি, ইংরেজি, বাংলার পাশাপাশি আরও অনেক ভাষায় দক্ষ ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ ভারতের সিআইডি ইন্সপেক্টর শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাসকে বিবাহ করেন। স্বামীর সঙ্গে মতাদর্শগত কোনও মিল ছিল না নীরার। নীরা আর্য নেতাজির ডাকে সাড়া দিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের রানী ঝাঁসি রেজিমেন্টে যোগ দেন।

পবিত্র মোহন রায় আজাদ ভারতীয় সেনাবাহিনীর মহিলা এবং পুরুষ উভয় গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান ছিলেন। নীরা আর্য আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রথম গুপ্তচর ছিলেন। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু নিজেই নীরাকে এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন।এই কাজে তাঁর সঙ্গী ছিলেন মনবতী আর্য,সরস্বতী রাজামণি,দুর্গা মল্লা গোর্খা এবং যুবক ড্যানিয়েল কালে |
নীরা আর্যের আত্মজীবনীতে বর্ণিত গুপ্তচরবৃত্তি সম্পর্কিত একটি অংশ তুলে ধরা হলো:
“আমার সাথে আরও একটি মেয়ে ছিল, নাম সরস্বতী রাজামণি। সে আমার চেয়ে বয়সে ছোট ছিল এবং তাঁর জন্ম বার্মায়। সে এবং আমি একসময় ইংরেজ অফিসারদের গুপ্তচরবৃত্তির দায়িত্ব পেয়েছিলাম। আমরা মেয়েরা ছেলেদের পোশাক পরি এবং ব্রিটিশ অফিসারদের বাড়ি এবং সামরিক শিবিরে কাজ শুরু করি। আমরা আজাদ হিন্দ ফৌজের জন্য এভাবে প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করেছি। আমাদের কাজটি ছিল কান খোলা রাখা,সহকর্মীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলি নিয়ে আলোচনা করা, তারপরে নেতাজীর কাছে তা পৌঁছে দেওয়া। কখনও কখনও আমাদের গুরুত্বপূর্ণ নথিও বহন করতে হত। যখন মেয়েদের গুপ্তচরবৃত্তির জন্য প্রেরণ করা হয়েছিল,আমাদের স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে,ধরা পড়লে নিজেরাই নিজেদের গুলি করে মৃত্যু বরণ করতে। একটি মেয়ে তা করতে মিস করেছে এবং তাকে ইংরেজরা জীবন্ত গ্রেপ্তার করেছিল। এতে আমাদের সংগঠনের সমূহ বিপদ ও ক্ষতি হবে বুঝে আমি এবং রাজামণি স্থির করেছিলাম যে, আমরা আমাদের সঙ্গীকে যে কোনভাবে মুক্ত করব। আমরা নপুংসক নর্তকীর পোশাক পরে যেখানে আমাদের সঙ্গী দুর্গাকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল সেখানে পৌঁছেছিলাম। আমরা অফিসারদের মাদক খাওয়ালাম এবং আমাদের সঙ্গীকে সাথে নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলাম। কিন্তু পালিয়ে যাওয়ার পথে পাহারায় থাকা এক সেনা গুলি চালায় এবং তাতে রাজামণির ডান পা গুলি বিদ্ধ হয়। কিন্তু তা স্বত্বেও সে কোনক্রমে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। এদিকে ধড়পাকড়ের জন্য অনুসন্ধান শুরু হলে আমি এবং দুর্গা একটা লম্বা গাছের উপরে আশ্রয় নিয়েছিলাম। অনুসন্ধান নীচে অব্যাহত ছিল, যার কারণে আমাদের তিন দিন ধরে গাছের উপরে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় থাকতে হয়েছিল। তিন দিন পরে আমরা সাহস করে সুকৌশলে সঙ্গীদের নিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের ঘাঁটিতে ফিরে আসি। রাজামণির সাহসিকতায় নেতাজি খুশী হয়ে তাকে আইএনএর রানী ঝাঁসি ব্রিগেডে লেফটেন্যান্ট এবং আমাকে অধিনায়ক করেছিলেন।”

আজাদ হিন্দ ফৌজের সমস্ত বন্দীকে দিল্লির লাল কেল্লায় বিচারে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু নীরাকে স্বামী হত্যার কারণে দ্বীপান্তরের সাজা দেওয়া হয়েছিল। জেলে বন্দীদশায় অকথ্য শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল নীরা আর্য- কে। স্বাধীনতার পরে, ফুল বিক্রি করে জীবনযাপন করেছিলেন । তবে কোনও সরকারী সহায়তা বা পেনশন গ্রহণ করেননি নীরা আর্য।

কী বর্বরচিত অত্যাচার করেছিল বৃটিশ তা কল্পনাতীত। মধ্যযুগীয় অত্যাচার তার কাছে কিছুই নয়। ‘ব্রেস্ট রিপার’ দিয়ে উপরে ফেলা হয়েছিল তার স্তন, কদর্যতা-পাশবিকতায় হার মেনেছিল মানুষের সামান্যতম বোধ।
কিন্তু সব থেকে লজ্জা বোধ হয় যখন দেখি স্বাধীনতার পরে নীরার আত্মত্যাগের কোনই সম্মান দেয়নি দেশ।
নীরা আন্দামানে আসার একবছর পর, স্বাধীন হয়েছিল ভারত। মুক্তি পেয়েছিলেন নীরা। কিন্তু তাঁর আত্মত্যাগের সম্মান দেয়নি দেশ। অভিমানে সাধারণের ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন অসাধারণ নীরা। বহু দশক পরে, নীরা আর্য্যকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল হায়দ্রাবাদের ফলকনুমা এলাকায়। চারমিনারের কাছে একটি বস্তির বিদ্ধস্ত চালাঘরে থেকে পথে পথে স্বাধীন ভারতে ফুল বেচে পেট চালাতেন তিনি। বস্তির লোকেরা তাঁকে ডাকতেন পেডাম্মা (ঠাকুমা) বলে। পরবর্তীকালে তাঁর পরিচয় জানার পর, তাঁকে সরকারি পেনসন দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। প্রস্তাবটি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন নীরা।

সকলের অলক্ষ্যে, ১৯৯৮ সালে ২৬ জুলাই, হায়দ্রাবাদের উসমানিয়া হাসপাতালে প্রয়াত হয়েছিলেন ৯৬ বছরের বীরাঙ্গনা নীরা আর্য্য। না, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষকৃত্য হয়নি তাঁর। জোটেনি গান স্যালুট। এক সহৃদয় সাংবাদিক তাঁর শেষকৃত্য করেছিলেন। তিনিই দিয়েছিলেন ফুলের মালা, ফেলেছিলেন দু’ফোঁটা চোখের জল। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে, যে কুঁড়েঘরে নীরা থাকতেন, সেটিও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কারণ সেটি দাঁড়িয়ে ছিল সরকারি জমির ওপর। সেদিনই নীরা বুঝতে পেরেছিলেন, যে মাটির জন্য তিনি রক্ত ঝরিয়েছিলেন, সেই মাটিও তাঁর নিজের ছিল না।
এমন আরো অনেকে আছেন জাদেন স্বাধীনতার পর বেঈমানেরা কোনই মর্যাদা দেয় নি। এমনই একজন ছিলেন উত্তর পূর্বের নাগাল্যান্ডের জয়া থাউসেন। তিনিও নেতাজির আই এন এ বাহিনীর সদস্য ছিলেন। নেতাজি যখন মনিপুর জয় করে ইম্ফলে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করছিলেন তখন ব্রিটিশ সেনা মণিপুরে ঢোকার সমস্ত পথ অবরোধ করে দিয়েছিল। যাতে মণিপুরে কোন রকম খাদ্য বা অন্য কোন রসদ না পৌঁছোয়। ডিমাসা নারী নেতাজির আই এন এ বাহিনীর ফৌজ জয়া নাগাল্যান্ডের কোহিমা থেকে ট্রাক ভর্তি অস্ত্রশস্ত্র ও রসদ নিয়ে নেতাজির কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখান থেকে ফিরে যাবার সময় তাকে ব্রিটিশ পুলিস গুলি করে হত্যা করেছিল। তাকেই বা আমরা কজন মনে রেখেছি? উত্তর কাছাড় পার্বত্য অঞ্চলের হাফলঙে ডিমাসা বীর শম্ভুধন ফংলোসা একাই একটি কাটারি দিয়ে কম করেও এক ডজন ব্রিটিশ সিপাহিকে খুন করেছিলেন। তার মধ্যে দুজন অফিসারও ছিলেন।পরবর্তীকালে ছল চাতুরী করে তারই এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির সাহায্যে ব্রিটিশ পুলিশ গভীর জঙ্গলে গুলি পিছে থেকে গুলি করে হত্যা করে শম্ভুধনকে। ভারতের স্বাধীনতা যোদ্ধার তালিকায় তার নাম পর্যন্ত ছিলনা। এনিয়ে প্রাক্তন তথ্য সম্প্রচার মন্ত্রী এম ভেংকাইয়া নাইডুর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি এই প্রতিবেদকের দেওয়া প্রমাণপত্র শিলচর পাঠিয়ে অনুসন্ধান করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেখান থেকে সত্যতা যাচাই করার পর নাইডু জী আমাকে সরকারি ভাবে চিঠি লিখে শম্ভুধন ফংলোসাকে স্বাধীনতা যোদ্ধার তালিকার অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন এবং সাংবাদিক সম্মেলন করে এমন আরো এক হাজার হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নাম ইতিহাসের পাতায় সংযোজন করেছিলেন।

পোস্টটি শেয়ার করুনঃ