এম,ডি রেজওয়ান আলী, বিরামপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি:-দিনাজপুর বিরামপুরে এক দশকে ধানের দাম কম উৎপাদনও বাড়েনি,বাড়েনি ধানের বাজারের দাম। বরং উচ্চমূল্য সত্ত্বেও বেড়েছে ধানের আবাদ। কাঙ্খিত দাম না পাওয়ায় সারা বছরজুড়ে ধান ফলিয়ে কৃষকের পরিশ্রমই সার। এবিষয়ে কৃষি অধিদপ্তরের দিনাজপুর আঞ্চলিক অফিসের তথ্যমতে,দিনাজপুর জেলায় গত এক দশকে ধানের আবাদ অনেক বেড়েছে। তবে বিঘাপ্রতি ফলন বাড়ে নাই। বাড়ে নাই ধানের মুল্য। কৃষি অধিদপ্তরের বাজার সংযোগ বিভাগের তথ্যমতে,গত ১০ বছরে গড়ে ধানের দাম বেড়েছে ৪৭৩ থেকে ৫৭৪ টাকা। সরকারি হিসেব অনুযায়ী,২৩-২৪ মওসুমে রোপা আমনের সরু জাতের ধান মণপ্রতি ১২৫১,মাঝারি ১১৩৫ এবং মোটা ধান ১০৪৮ টাকা দাম পেয়েছেন কৃষক। এ ছাড়া গত বছর মণপ্রতি ১৬৩৬,১২৩৪ এবং ১১৩৭ টাকা করে কৃষকের ধান বিক্রির কথা বলছে বাজার সংযোগ বিভাগ। এবিষয়ে তাদের হিসেব মতে,২১-২২ মওসুমে সরু ধান ১২০৪,মাঝারি ১০৫৯,মোটা ৯৬৮,২০-২১ মওসুমে কৃষক ধানের দাম পেয়েছে ১২৩২ থেকে মাঝারি ১১৩৬ মোটা ১০৫১ টাকা,১৯-২০ মওসুমে তিন জাতের ধান ৬৩৮ থেকে ৮৯৬ টাকা,১৮-১৯ মওসুমে ৬৬৩ থেকে ৭০৩ এবং ৮২৮ টাকা,১৭-১৮ মওসুমে ৯১৩ থেকে ১০৩৬,১১৩৫ টাকা,১৬-১৭ মওসুমে ৭৮২ থেকে ৮৬২ এবং ৮৯০টাকা,১৫-১৬ মওসুমে ৫৪৯ থেকে ৬৬২ এবং ৬৭৭ টাকা,১৪-১৫ মওসুমে মোটা ৬৭৪,মাঝারি ৭১৭ এবং সরু ধানের মণপ্রতি ৭৮২ টাকা দাম পেয়েছে কৃষক।
স্হানীয় কৃষকের মতে,বছর ঘুরলেই বেড়ে যায় ধান চাষের খরচ। ২০১৪ সালের দিকে বিঘায় ৬ হাজার টাকা খরচে কৃষক ৬০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করেছেন। সে সময় ফলনও ভালো ছিল। এই দশ বছরে সার-কীটনাশক,বীজতলা তৈরি,শ্রমিক খরচ,জমি লীজের মূল্যসহ ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত কৃষকের খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ। এখন বিঘায় ১৫ হাজার টাকা ব্যয়ে কয়েকটি জাতের ধানের ফলন ১২ থেকে ১৫ মণে নেমে এসেছে। দশ বছর আগের ৬০০ টাকা মণের ধানের দাম বেড়ে হয়েছে ৯০০ টাকা। এই মূল্যে কৃষকের প্রাপ্তি শুধু একসঙ্গে ধান ঘরে তোলা। দিনাজপুর আঞ্চলিক কৃষি অধিদপ্তরের রেকর্ড বলছে,২০২৩-২৪ অর্থ বছরে চার জেলায় রোপা আমন মওসুমে মোট ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪৮ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড,উফশী এবং স্থানীয় জাতের ধান চাষ করা হয়েছিল। ওই মওসুমে ধানের উৎপাদন হয় ১৯ লাখ ৩ হাজার ৯১৫ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বগুড়ায় ৮ লাখ ৯৮ হাজার ৮৭৬, জয়পুরহাটে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭০১, পাবনায় ২ লাখ ৮৭ হাজার ১০৬ এবং সিরাজগঞ্জ জেলায় ৩ লাখ ৮৩ হাজার ২৩২ মেট্রিক টন উৎপাদন হয়েছে।
উপজেলায় ২৩ হাজার ৯৪৮ হেক্টর ধানি জমি বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসঙ্গে ধানের উৎপাদন বেড়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯৭০ মেট্রিকটন। বিরামপুর উপজেলার কৃষক ফারুক,আবু সোবহান,ইদ্রিস মিয়া,আফাজ আলীসহ এই অঞ্চলের অন্তত ৫০ জন কৃষক
প্রতিবেদকে জানিয়েছেন,এই বছর নিজের জমিতে একবিঘা ধান চাষ করতে খরচ হয়েছে ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা। বর্গাচাষিদের ১৯ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় ২০ মণের জায়গায় এবার উত্তরাঞ্চলে বিঘাপ্রতি ধানের ফলন হয়েছে ১০ থেকে ১২ মণহারে। শত প্রতিকূলা ভেঙে কৃষকের কষ্টার্জিত ধানের পাইকারি দাম ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা পর্যন্ত। ২০ জন কৃষক জানালেন,প্রতি বছর লাখ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন করছেন তারা। কিন্তু এ পর্যন্ত ধানের কাঙ্খিত দাম পাননি। ধানের বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী তাদের উৎপাদন খরচ উঠছে না। উপরন্ত বিঘায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা লোকশান গুনতে হচ্ছে। হাট-বাজারে ক্রেতা কম থাকার সুযোগে কম দামেই ফরিয়াদের কাছে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। কৃষি অধিদপ্তরের রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে উপজেলা ও জেলায় বোরো মওসুমে ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩০৯ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড,উফশী ও স্থানীয় জাতের ধান উৎপাদন হয় ২৫ লাখ ৯০ হাজার ৪৫৬ মেট্রিক টন। এই চার জেলায় ১৩-১৪ অর্থ বছরে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৭১ হেক্টরে ২৪ লাখ ৬৯ হাজার ৪০৬ মেট্টিক টন,১৪-১৫ মওসুমে ৩লাখ ৭৬ হাজার ৩৬৯ হেক্টরে ২৩ লাখ ৮১ হাজার ২৯৯ মেট্টিক টন,১৫-১৬ মওসুমে ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৯১৫ হেক্টর জমিতে ২৩ লাখ ৩ হাজার ৬৪৩ মেট্টিক টন, ১৬-১৭ মওসুমে ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৮৬৮ হেক্টরে ২২ লাখ ৬২ হাজার ১৮০ মেট্টিক টন,১৭-১৮ মওসুমে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৭৬৫ হেক্টর জমিতে ২৩ লাখ ৩৯ হাজার ৯৫৮ মেট্রিক টন,১৮-১৯ মওসুমে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৬০৩ হেক্টরে ২৩ লাখ ১৬ হাজার ৬৫৫ মেট্টিক টন, ১৯-২০ মওসুমে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৯৯৩ হেক্টরে ২২ লাখ ৭৮ হাজার ৭৩৪ মেট্টিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এই অঞ্চলে ধান চাষ বেড়েছে ১ হাজার ৭৬২ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন বেড়েছে ২ লাখ ৯ হাজার ১৫৭ মেট্রিক টন। বেশ কয়েকটি উপজেলার হাটবাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,বিআর-৪৯ জাতের ধান ১ হাজার ১২০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা,বিআর-৫১ জাত ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০,শম্পা কাটারি ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ ও ৯০ জাতের ধান ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ দামে ধান বিক্রি করে কৃষকরা লোকসান গুনলেও ফড়িয়ারা লাভবান হচ্ছেন। তারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কম দামে ধান কিনে বড় অটোমিলে বেশি দামে বিক্রি করছেন। নিয়মিত ভাবে ধান গুলো স্থানান্তর অব্যাহত রয়েছে।

পোস্টটি শেয়ার করুনঃ