উজ্জ্বল কুমার সরকারঃ
নওগাঁর মহাদেবপুরে প্রায় প্রতিটি সরকারি টেন্ডারে সক্রিয় রয়েছে এক ভয়াবহ শক্তিশালী নিগো সিন্ডিকেট। যে কোন সরকারি টেন্ডার হলেই তারা নিজেদের মধ্যে নিগোশিয়েশনের মাধ্যমে কম দামে টেন্ডার হাতিয়ে নেয়। ওই বৈঠকেই তারা ওই টেন্ডারের মালামাল চড়া দামে বিক্রি করে লাভের টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নেয়। ফলে মোটা অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয় সরকার। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অফিসের একশ্রেণির অসাধূ কর্মচারি সরাসরি নিগো সিন্ডিকেটকে সহযোগিতা করে থাকে। এতে তারাও লাভের ভাগ পায়। নিয়মানুযায়ী যে কোন টেন্ডারের বহুল প্রচারের বিধান থাকলেও অসাধূ কর্মচারিদের তৎপরতায় ওই সিন্ডিকেটের সদস্য ছাড়া অন্যরা টেন্ডারের তারিখ, স্থান প্রভৃতি বিষয়ে কিছুই জানতে পারেন না। ফলে ইচ্ছা থাকলেও তারা ডাকে অংশ নিতে পারেন না। ডাক থেকে যায় সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। এনিয়ে বিভিন্ন সময় বিরোধেরও সৃষ্টি হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন এক্ষেত্রে প্রশাসন সম্পূর্ণ অসহায়। কেউ বেশি টাকা না ডাকলে প্রশাসনের কিছু করার থাকে না। সর্বোচ্চ ডাককারিকেই টেন্ডার দিতে হয়। এক্ষেত্রে সিন্ডিকেট হলো কিনা, নিগোশিয়েট হলো কিনা তা দেখার উপায় নেই।
গত ১৮ মার্চ মহাদেবপুর উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এলজিইডি উপজেলার ভীমপুর ইউনিয়ন সদরের চকগৌরিহাটের পুরাতন একটি বিশাল মাছ শেড ও একটি কবুতরের শেডের নিলাম ডাক দেয়। এগুলো ভেঙ্গে এই স্থানে নতুন শেড নির্মাণ করা হবে। এই বিশাল দুটি শেডের মালামালের সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয় মাত্র ১৩ হাজার পাঁচশ’ টাকা। ১৩ জন প্রত্যেকে প্রয়োজনীয় তিন হাজার পাঁচশ’ টাকা করে জামানত জমা দিয়ে নিলাম ডাকে অংশ নেন। সর্বোচ্চ ডাক ওঠে ১৬ হাজার পাঁচশ’ টাকা। উপজেলার সফাপুর ইউনিয়ন যুবলীগের নেতা রেজাউল ইসলাম পান সেটি। কিন্তু অভিযোগ করা হয়েছে যে, এই সরকারি ডাকের পর পরই সেখানেই চকগৌরিহাট এলাকার জামাত নেতা ওয়ালিউল ইসলাম রেজাউল ইসলামের কাছ থেকে ওই দুটি স্থাপনা ৮৪ হাজার টাকায় কিনে নেন। এই খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে বিরুপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ নিগো সিন্ডিকেটের কারসাজিতে সরকার মোটা অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে। পরে বিক্রি হওয়ার অতিরিক্ত দামটাও সরকার পেতো। সংশ্লিষ্ট অফিসের কর্মকর্তারা সিন্ডিকেট সদস্যদের সহযোগিতা করতে সরকারি দাম খুম কম দেখিয়েছে বলেও তারা অভিযোগ করেন। ওয়ালিউল ইসলামের ভাই লিয়াকত আলী গত ২২ মার্চ ওই স্থাপনা ভাঙ্গতে গেলে স্থানীয় বাধা দেন। এনিয়ে উভয়পক্ষে ধাক্কাধাক্কি ও বচসার সৃষ্টি হয়। এতে লিয়াকত আলী আহত হন। শেষে ওই স্থাপনা না ভেঙ্গেই তারা ফিরে যান। এব্যাপারে মহাদেবপুর থানায় অভিযোগ দেয়া হয়েছে। ভীমপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন বকুল অভিযোগ করেন যে, নিলাম ডাকের দিন সারাদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। ডাকের আগে কোথাও এ সংক্রান্ত কোন নোটিশ টাঙ্গানো হয়নি। নিয়মানুয়ায়ী ঢোল শহরত বা মাইকিংও করা হয়নি। যে ১৩ জন যুবক ডাকে অংশ নেন তারা কেউই এই এলাকার নয়। এলাকার কোন মানুষ খবর না পেলেও দূর থেকে তারা কিভাবে খবর পেলেন তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তিনি এই শেডগুলোর নিলাম বাতিল করে নতুন করে টেন্ডার দেয়ার দাবি জানান। জানতে চাইলে রেজাউল ইসলাম ও ওয়ালিউল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। ওয়ালিউল ইসলাম জানান, ইটগুলো কাজে লাগানোর জন্য তিনি সেগুলো রেজাউলের কাছ থেকে কিনেছেন। ওয়ালিউল ও আরো কয়েজন জানান, সরকারি ডাকে তাদেরকে অংশ নিতে দেয়া হয়নি। ডাকে অংশ নিতে দিলে তারা বেশি দামই ডাকতেন। জানতে চাইলে উপজেলা প্রকৌশলী সৈকত দাস জানান, নিয়ম মেনেই হাটের শেডগুলো নিলাম দেয়া হয়েছে। কেউ যদি বেশি না ডাকেন তাতে প্রশাসনের কিছু করার নেই বলেও জানান তিনি। এরআগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি উপজেলা ভূমি অফিস উপজেলার সফাপুর ইউনিয়নের পাঁঠাকাটা পয়েন্টে আত্রাই নদী থেকে অবৈধভাবে উত্তোলন করা বিপুল পরিমাণ বালু নিলামের আয়োজন করে। এখানেও নিলামের বিষয়টি বহুল প্রচার করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। উপজেলা সদর থেকে একদল চিহ্নিত নিগোকারি সেখানে উপস্থিত হন। নওগাঁ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা অজ্ঞাত কারণে বালুর সরকারি মূল্য প্রকৃত মূল্যের ১০ শতাংশেরও কম নির্ধারণ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ১২ জন ডাককারি প্রত্যেকে মাত্র ২০ হাজার টাকা জামানত জমা দিয়ে ডাকে অংশ নেন। কিন্তু ডাকেন মাত্র তিন জন। সর্বোচ্চ ডাককারিকে দুই লক্ষ ৬০ হাজার টাকায় সে বালু দেয়া হয়। কিন্তু এরপরপরই সে বালু আরো চার লক্ষ ৫০ হাজার টাকা বেশি দিয়ে কিনে নেন অভিযুক্ত অবৈধ বালু উত্তোলনকারি হাজী মোয়াজ্জেম হোসেন নিজেই। এই বেশি টাকা নিগোকারি ওই ১২ জন প্রত্যেকে ৩৭ হাজার পাঁচশ’ টাকা করে ভাগবাটোয়ারা করে নেন। নিগোকারিদের তৎপরতায় এই মোটা অংকের টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয় সরকার। জানতে চাইলে উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) রিফাত আরা জানান, নিয়মানুযায়ী ডাক দেয়া হয়েছে। এখানে কোন অনিয়ম হয়নি। কেউ নিগোশিয়েট করলো কিনা তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। গতবছর উপজেলার ভীমপুর ইউনিয়নের হিন্দুবাঘা মেলার ডাক ছিল চার লাখ টাকা। কিন্তু নিগো সিন্ডিকেটের কারসাজিতে এবার সে ডাক নেমে আসে মাত্র এক লাখ টাকায়। এখানে সরকার বঞ্চিত হয় তিন লাখ টাকার রাজস্ব থেকে। যেসব টেন্ডার গোপনে বাক্সে ফেলতে হয়, প্রয়োজনে সেগুলোতেও নিগো সিন্ডিকেট থাবা দেয়। যে কয়জন সিডিউল কেনেন, তাদেরকে একত্রিত করে টাকার চুক্তিতে ম্যানেজ করে মাত্র তিনটি সিডিউল জমা দেয়া হয় সরকারি মূল্যের চেয়ে সামান্য কম দেখিয়ে। স্থানীয়রা অবিলম্বে এই নিগোকারিদের তৎপরতা বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

পোস্টটি শেয়ার করুনঃ