গাইল মিজাপুর চার কোটি ছয় লাখ টাকা ব্যয়ে মির্জাপুর সদরের পাহাড়পুড় থেকে কামারপাড়া পর্যন্ত প্রায় আট কিলোমিটারজুড়ে আঞ্চলিক সড়ক পাকা করার কাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবাদ করেও সুফল পাচ্ছেন না তারা। নিম্নমানের ইট, খোয়া, বালি দিয়ে ঠিকাদার কাজ করছেন। স্থানীয়রা আরও বলেন, বৃষ্টির পানিতে ভিজে মেকাডামের খোয়াগুলো কাদায় পরিণত হচ্ছে।

এলজিইডি মির্জাপুর অফিসের তত্ত্বাবধানে চলছে আঞ্চলিক এই সড়কের নির্মাণকাজ। অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি হল- টাঙ্গাইলের সৈয়দ মজিবর রহমান অ্যান্ড অবনী এন্টারপ্রাইজ (জেবি)।

এলাকাবাসী স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কর্মকর্তাদের প্রতি অভিযোগ করে বলেন, ঠিকাদারের সঙ্গে তাদের যোগসাজস আছে। এজন্য কেউ-ই মাঠে নেই। ঝোলানো হয়নি কোনো কার্যাদেশের সাইনবোর্ড।

জানা গেছে, এটি উপজেলার মির্জাপুর সদরের সাথে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগের একমাত্র রাস্তা। উপজেলার ভাওড়া, উয়ার্শী ও বহুরিয়া ইউনিয়নের ২০-২৫টি গ্রামের লোকজন ছাড়াও সাটুরিয়া ও ধামরাই উপজেলার হাজার হাজার মানুষ এই সড়ক দিয়ে মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করে থাকেন।

রাস্তাটির করুণ দশার কারণে দক্ষিণ মির্জাপুরে উৎপাদিত ধান, সরিষা, লেবু ও সবজি হাটে না নিতে পেরে ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন কৃষক।

রাস্তাটি নির্মাণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে স্থানীয় এলজিইডির অধীনে চার কোটি ছয় লাখ টাকা ব্যয়ে আট কিলোমিটার রাস্তাটির টেন্ডার আহ্বান করা হয়। সৈয়দ মজিবর রহমান অ্যান্ড অবনী এন্টারপ্রাইজ (জেবি) নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রাস্তাটি বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচিত হন। তারা কার্যাদেশ পাওয়ার পর একাধিকবার কাজ শুরু করেন। রাস্তাটি খোঁড়াখুঁড়ি করে রাখায় জনদুর্ভোগ শুরু হয়। এ নিয়ে কালের কণ্ঠসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সচিত্র সংবাদ প্রকাশ হলে স্থানীয় এমপির নির্দেশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পুনরায় কাজ শুরু করেন। এবারও উঠেছে অনিয়মের অভিযোগ।

দরপত্র অনুযায়ী রাস্তার দুপাশে মাটি ফেলে ১৬ ফুট প্রশস্ত ও উঁচু করার পর এক ইঞ্চি কার্পেটিং করার কথা। এর মধ্যে ১২ ফুট কার্পেটিং রাস্তা ছাড়াও দুই পাশে দুই ফুট করে ফুটপাত এবং দুই ফুট করে সোলডার নির্মাণের কথা থাকলেও তা করা হয়নি। কোথাও কোথাও ইটের সলিং করা হলেও সোলডার করা হয়নি। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে গাইড ওয়াল নির্মাণ করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি।

রাস্তাটিতে চার ইঞ্চি মেকাডাম করতে নিম্নমানের ইটের খোয়া রাস্তায় ব্যবহার করা হচ্ছে বলে স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেছেন।

রাস্তার কাজে নিয়োজিত দিনমজুর নাজমুল, লুৎফর ও শরীফ মিয়ার কাছে খোয়া ভেজা থাকার কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন, ঠিকাদার পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাস্তায় ফেলতে বলছেন। খোয়া ভিজালে কী হয় জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘খোয়ার কালার উজ্জ্বল দেখায়।’

মির্জাপুর ঘোষ পাড়া গ্রামের অনিমা ঘোষ বলেন, ‘চুলায় রান্নার পর যে মাটি হয়, সেই পোড়ামাটি দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে।’

পাহাড়পুর গ্রামের আওলাদ খান জানান, ‘ভাটায় পড়ে থাকা নষ্ট ইটের খোয়া দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। পানি দিয়ে ভিজিয়ে ইটের রং পরিবর্তন করা হচ্ছে। এতে আমরা হতাশ।’

সরিষাদাইড় গ্রামের খন্দকার মাকসুদুর রহমান ডন বলেন, ‘রাস্তাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চলাচল করে। এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে রাস্তাটি পাকা করা হচ্ছে। রাস্তায় যে খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে তা চার নম্বর ইটের খোয়াও না।’

ইমান মিয়া বলেন, ‘দ্যাশটা চোরের কারখানা হইয়া গেছে। রাস্তায় ব্যবহার করা ইট পোড়া মাটির চেয়ে খারাপ। পোড়া মাটিও শক্ত আছে। হাত দিয়ে টিপ দিলে খোয়া ভেঙে যাচ্ছে।’ পলাশ ও হান্নান নামের পথচারী জানান, ‘রাস্তাটি নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার হচ্ছে। বৃষ্টির পানিতে খোয়া ভিজে কাদায় পরিণত হচ্ছে। প্রতিবাদ করেও কোনো লাভ হচ্ছে না।’

তবে অবনী এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. হেকমত আলীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘সব ভাটায় ইট শেষ পর্যায়ে। খোয়া পাওয়া যাচ্ছে না। রাস্তাটি স্থানীয় এমপি খান আহমেদ শুভর প্রতিশ্রুতি থাকায় তার নির্দেশে মধুপুর থেকে ১১০ টাকা ফুট খোয়া কিনে রাস্তাটি নির্মাণ করছি। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী কিছু খোয়া দিয়েছে যা নিম্নমানের বলে জেনেছি। বিষয়টি জানার পর ওই ব্যবসায়ীর খোয়া রাস্তায় ব্যবহার করা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছি।’

মির্জাপুর উপজেলা প্রকৌশলী মো. আরিফুর রহমান জানান, ‘খোয়ার মান ভালো না হওয়ায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে পত্র দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নিম্নমানের খোয়া সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

পোস্টটি শেয়ার করুনঃ