উজ্জ্বল কুমার সরকারঃ
১ এপ্রিল কবি, সম্পাদক, সমালোচক, সাহিত্য সংগঠক, একুশে সংকলনের প্রথম সম্পাদক, মুক্তিযুদ্ধের দলিলের সম্পাদক হাসান হাফিজুর রহমানের প্রয়াণ দিবসে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। তাঁর জন্মঃ- ১৪ জুলাই, ১৯৩২ এবং মৃত্যু – ১ এপ্রিল, ১৯৮৩। ১৯৫২ সালের বাংলাভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অবদান রাখেন। ১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হন। সে বছর তিনি নাট্যচক্রের সভাপতি হন এবং দুটি গুরুত্বপূর্ন প্রবন্ধ কবিতার বিষয়বস্তু ও আধুনিক কবিতার লক্ষন রচনা করেন। ষাটের দশকে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক বাংলার অক্ষর বদলিয়ে আরবি অক্ষরে রূপান্তরের ষড়যন্ত্র ও রেডিও টিভিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যকর্ম প্রচারের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবার দাবিতে জোরালো আন্দোলনে অংশ নেন। একুশের চেতনার ওপর ভিত্তি করে তাঁর কবিতা অমর একুশে প্রকাশিত হয় ১৯৫২ সালেই। কিছু লেখা একত্র করে ১৯৫৩ সালে তিনি প্রথম ফেব্রুয়ারীর সংকলন প্রকাশ করেন। তিনি বাঙালি কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে অবিচল আস্থাশীল ছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি সরাসরি অংশ নেন।
হাসান হাফিজুর রহমান জামালপুর শহরে তাঁর মামা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পৈত্রিক বাড়ি ছিল জামালপুর জেলার ইসলামপুর থানার কুলকান্দি গ্রামে। তাঁর বাবার নাম আবদুর রহমান এবং মার নাম হাফিজা খাতুন। হাসান হাফিজুর রহমানের বাবার গ্রন্থাগারে ছিল বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখের বই, অন্যদিকে মায়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকতো মুসলমান লেখকদের উল্লেখযোগ্য বই। ফলে পছন্দ-মতো বই পড়ার সুযোগ পারিবারিক সূত্রেই পেয়েছিলেন হাসান হাফিজুর রহমান। তাঁর বাবার একটা অদ্ভুত মানসিকতা ছিল, তিনি সরাসরি কোনোদিন বই পড়তে বলতেন না, কিন্তু এনে দিতেন। সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় দেশের বাড়িতে হাসান হাফিজুর রহমান একটি লাইব্রেরী গড়ে তুলেছিলেন। রাজপুত বীরদের কাহিনীভিত্তিক অনেক বই তখন পাওয়া যেত, সেগুলো ক্রয় করতেন তিনি। প্রবেশিকা পরীক্ষার আগে লরেন্সের (ডি.এইচ) ‘লেডি চ্যাটার্লিস লাভার’ নামের মূল বইটি তিনি পান। স্যার ডব্লিউ স্কটের ‘আইভ্যানহো’ বইটিও পড়ে ফেলেন সাথে সাথে। বিদেশী সাহিত্যের প্রচুর অনুবাদ তিনি এ সময় পড়েছেন। বসুমতী সাহিত্য মন্দির থেকে যে সব গ্রন্থ প্রকাশিত হতো, তা সংগ্রহ করে পড়েছেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়-এর বইও পড়ছেন তিনি। বিশেষ করে তাঁর ‘গণদেবতা’ ও ‘পঞ্চগ্রাম’ হাসানের প্রিয় বই। সৈয়দ আলী আহসান সাহেবের বাসা ছিলো তাঁদের বাসার পাশে। তাঁর ছোটো ভাই সৈয়দ আলী রেজাও তাঁকে বই সরবরাহ করতেন। ‘বঙ্কিম-রচনাবলী’, ‘রবীন্দ্র-রচনাবলী’, ‘শরৎ-রচনাবলী’ সহ প্রায় লেখকের বিখ্যাত বইগুলো পড়ে ফেলেন তিনি। বাল্যকাল থেকে সাহিত্যের প্রতি এই দুর্বার আকর্ষণই তাঁকে লেখালেখিতে অনুপ্রেরণা যোগায় এবং পরবর্তীতে তিনি এদেশের অন্যতম কবি হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। বাংলা কবিতায় রুচিবোধের পরিবর্তনে হাসান হাফিজুর রহমানের অবদান অসামান্য। তিনি একাধারে একজন বিশিষ্ট কবি, প্রগতিশীল আন্দোলনের একজন মহান কর্মী, মননশীল প্রবন্ধকার, খ্যাতিমান অধ্যাপক, বিশিষ্ট সাংবাদিক, কথাশিল্পী, সমালোচক এবং অসাধারণ সাহিত্য-সংস্কৃতি সংগঠক।
তাঁর পেশাজীবন খুব বৈচিত্রময় ছিল। সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকায় ১৯৫২ সালে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর তিনি একাধারে সওগাত (১৯৫৩), ইত্তেহাদ (১৯৫৫-৫৪) ও দৈনিক পাকিস্তানে (১৯৬৫) সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং স্বাধীনতার পর দৈনিক বাংলায় সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি নিযুক্ত হন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি ১৯৫৭-১৯৬৪ সাল পর্যন্ত জগন্নাথ কলেজে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। এছাড়াও তিনি ১৯৭৩ সালে মস্কোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেস কাউন্সিলর পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৮ সালে হাসান হাফিজুর রহমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্প’-এর প্রধান নিযুক্ত হন। প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৯৮৩ সালের ১৭ জানুয়ারি চিকিৎসার জন্য তাঁকে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রেরণ করা হয় এবং মস্কোর সেন্ট্রাল ক্লিনিক হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।

পোস্টটি শেয়ার করুনঃ